প্রায় চার দশক আগে পারিবারিক মনোমালিন্যের জেরে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন জবেদ আলি। স্ত্রী ও পাঁচ বছরের সন্তানকে রেখে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা একসময় ধরে নিয়েছিলেন, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার খোঁজ করা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ৩৮ বছর পর হঠাৎ নিজ বাড়িতে ফিরে এসে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন জবেদ আলি।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী বাজারের ক্যাম্পপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি এখন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পর স্বজনদের কাছে ফিরলেও সবচেয়ে বেশি দূরত্ব রয়ে গেছে তার স্ত্রী রুশিয়া খাতুনের সঙ্গে। স্বামীর ফিরে আসাকে তিনি এখনো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। বরং বছরের পর বছর জমে থাকা অভিমান তাকে আরও কঠোর অবস্থানে রেখেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে পারিবারিক বিরোধের জেরে বাড়ি ছাড়েন জবেদ আলি। সেই সময় তার ছেলে জাহাঙ্গীর আলমের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। এরপর থেকে পরিবার তার কোনো খোঁজ পায়নি। বিভিন্ন এলাকায় আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে খোঁজ চালিয়েও কোনো তথ্য মেলেনি। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে মৃত বলেই ধরে নেন।
এদিকে স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন রুশিয়া খাতুন। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে আর্থিক সংকট দেখা দিলে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সংসার চালানো এবং সন্তানকে বড় করে তোলার জন্য মানুষের বাড়িতে কাজসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হন তিনি।
রুশিয়া খাতুনের অভিযোগ, জবেদ আলি শুধু বাড়ি ছেড়ে যাননি, বরং অন্যত্র আরেকটি সংসারও গড়ে তুলেছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর তিনি প্রথম স্ত্রী ও সন্তানকে সম্পূর্ণভাবে অবহেলা করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তাকে একাই সংগ্রাম করে সন্তানকে মানুষ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “সন্তানকে নিয়ে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছি। মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালিয়েছি। এমন কোনো কষ্ট নেই যা আমাকে সহ্য করতে হয়নি। তখন তার কোনো খোঁজ ছিল না, কোনো দায়িত্বও নেয়নি।”
রুশিয়া খাতুন জানান, অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে তার ছেলে জাহাঙ্গীর আলম বড় হয়েছেন। পরে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেন। বর্তমানে তিনি কুয়েতে কর্মরত রয়েছেন। তার পাঠানো অর্থে পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। বহু বছরের দুঃখ-কষ্টের পর এখন তারা কিছুটা স্বস্তিতে জীবনযাপন করছেন।
এ কারণেই স্বামীর হঠাৎ ফিরে আসাকে সহজভাবে নিতে পারছেন না রুশিয়া খাতুন। তার ভাষায়, “যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন তিনি পাশে ছিলেন না। এখন সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে, তাই কেন ফিরে এসেছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর আমি পাই না। ছেলে দেশে ফিরে এলে তার সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে জবেদ আলি স্বীকার করেছেন যে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কুন্ডুরিয়া গ্রামে দ্বিতীয় সংসার গড়েছিলেন। সেই সংসারে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে দ্বিতীয় স্ত্রী ইতোমধ্যে মারা গেছেন বলে জানান তিনি।
দীর্ঘ ৩৮ বছর কোথায় ছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জবেদ আলি বলেন, তিনি বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবন কাটিয়েছেন। তবে বাড়ি ছাড়ার মূল কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। তিনি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় বলে উল্লেখ করেন।
জবেদ আলির ভাই ও ভাতিজারা জানান, বহু বছর কোনো খোঁজ না পাওয়ায় প্রায় তিন বছর আগে তারা ধরে নিয়েছিলেন যে তিনি মারা গেছেন। তবে হঠাৎ ফিরে আসায় তারা আনন্দিত। তারা আশা করছেন, পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে একদিন সব অভিমান দূর হবে এবং পরিবারটি আবার একসঙ্গে বসবাস করতে পারবে।
এদিকে জবেদ আলিও পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে চান। তিনি বলেন, “যদি স্ত্রী ও ছেলে আমাকে মেনে নেয়, তাহলে আমার মেয়েকেও এখানে নিয়ে আসব। জীবনের বাকি সময়টা পরিবারের সঙ্গে কাটাতে চাই।”
৩৮ বছর পর এক ব্যক্তির ঘরে ফেরা যেমন স্বজনদের জন্য বিস্ময়ের ঘটনা, তেমনি এটি দীর্ঘ বিচ্ছেদ, দায়িত্বহীনতা, অভিমান এবং পারিবারিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতারও একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এখন সবার নজর জাহাঙ্গীর আলম দেশে ফিরে কী সিদ্ধান্ত নেন এবং এই বিচ্ছিন্ন পরিবারটি আবার একত্রিত হতে পারে কি না, সেদিকেই।
SEO ট্যাগ: জবেদ আলি, ৩৮ বছর পর বাড়ি ফেরা, নিখোঁজ স্বামী, মেহেরপুর সংবাদ, গাংনী উপজেলা, রুশিয়া খাতুন, পারিবারিক ঘটনা, ভাইরাল খবর, বাংলাদেশ মানবিক গল্প, নিখোঁজ ব্যক্তি, দ্বিতীয় সংসার, কুয়েত প্রবাসী ছেলে, পারিবারিক পুনর্মিলন, মানবজীবনের গল্প, সামাজিক সংবাদ, মেহেরপুর নিউজ, বাংলাদেশ সংবাদ, আবেগঘন ঘটনা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আলোচিত খবর।