দেশজুড়ে তীব্র গরমে জনজীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। চলতি বছর প্রথমবারের মতো একদিনে দেশের ৪৮টি জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে, যা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী এ বছরের সর্বোচ্চ বিস্তৃত তাপপ্রবাহ। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও দেশে এখনো প্রবেশ করেনি মৌসুমি বায়ু। ফলে বৃষ্টির দেখা মিললেও তাপমাত্রা ও ভ্যাপসা গরম থেকে স্বস্তি পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৩ জুন) দেশের পাঁচটি বিভাগজুড়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও রংপুর বিভাগের অধিকাংশ জেলা তাপপ্রবাহের আওতায় ছিল। এর বাইরে চাঁদপুর, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাও তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে। সব মিলিয়ে দেশের ৪৮টি জেলায় এই আবহাওয়া পরিস্থিতি বিরাজ করে, যা চলতি বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সাধারণত মে মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ ঘটে এবং এর প্রভাবে দেশজুড়ে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পায়। তবে এবার জুন মাস শুরু হলেও মৌসুমি বায়ুর কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকলেও মানুষের কাছে গরমের অনুভূতি আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠছে।
বুধবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুরে, যেখানে তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি জুন মাসে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে অন্যতম। তীব্র রোদ ও আর্দ্রতার কারণে নগরবাসীকে চরম অস্বস্তি নিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, চলতি বছরে এত বিস্তৃত এলাকায় একসঙ্গে তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার নজির নেই। তিনি বলেন, জুন মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। তবে শুক্রবার থেকে তাপপ্রবাহের বিস্তৃতি কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের মতে, মৌসুমি বায়ুর প্রবেশে এবার দুই থেকে তিন দিনের অতিরিক্ত বিলম্ব হতে পারে। তিনি জানান, মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পরও দেশজুড়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত শুরু হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। ফলে আপাতত গরম থেকে বড় ধরনের স্বস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
আজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে। রাজধানী ঢাকাতেও হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। তবে এই বৃষ্টি সাময়িক স্বস্তি দিলেও সামগ্রিকভাবে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ বছর এপ্রিল ও মে মাসে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন ছিল। সাধারণত এপ্রিল মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় এবং মে মাসেও তীব্র গরম বিরাজ করে। কিন্তু চলতি বছরে এই দুই মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশেরও বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। ফলে ওই সময়ে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু জুনে এসে মৌসুমি বায়ুর বিলম্বিত প্রবেশ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ভ্যাপসা গরমে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক এবং খোলা আকাশের নিচে কর্মরত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা পর্যাপ্ত পানি পান, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া দিনের সবচেয়ে গরম সময় বাইরে না থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া বিভাগ আশা করছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মৌসুমি বায়ু দেশে প্রবেশ করলে বৃষ্টিপাত বাড়বে এবং ধীরে ধীরে তাপপ্রবাহের তীব্রতা কমে আসবে। তবে ততদিন পর্যন্ত দেশের মানুষের জন্য গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে।