রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া কারণ দর্শানোর (শোকজ) জবাবে সন্তুষ্ট নয় সরকার। এ ঘটনায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
বুধবার (১০ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অস্পষ্ট রয়েছে। সরকারের দৃষ্টিতে ওই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা পরিবেশ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও হাসপাতালের জবাব বিশ্লেষণ করে সরকারের পক্ষ থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ছয় নবজাতক কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যায়। একই ওয়ার্ডে থাকা একাধিক শিশুর এমন আকস্মিক মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের বিভিন্ন ধরনের অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির বিষয় উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নবজাতকদের রাখা হয়েছিল, সেটি নবজাতক বা অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের জন্য উপযুক্ত ছিল না। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা ছিল না এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও প্রয়োজনের তুলনায় দুর্বল ছিল।
এছাড়া ওয়ার্ডের পরিবেশগত পরিস্থিতি রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে নবজাতকদের মতো সংবেদনশীল রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড সেখানে অনুসরণ করা হয়নি। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ঘাটতি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটি আরও জানায়, ঘটনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো চিকিৎসক ওয়ার্ডে উপস্থিত ছিলেন না। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা জরুরি সেবা নিশ্চিত করা হয়নি। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্তে দেখা গেছে জন্মের পর নবজাতকদের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল। তাদের কারও বিশেষ চিকিৎসা বা ইনকিউবেটরের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের অবস্থার অবনতি হলেও যথাযথ তদারকি, পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
ঘটনার পর গত ৪ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে। ওই নোটিশের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেও সরকার তা সন্তোষজনক বলে মনে করছে না। ফলে হাসপাতালের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জরিমানা, লাইসেন্স সংক্রান্ত পদক্ষেপ বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো এখন আলোচনায় রয়েছে।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মান, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং রোগী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে এখন সবার নজর রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে হাসপাতালগুলোর তদারকি ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।