যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক হামলার পরও দ্রুতগতিতে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে ইরান। দেশটির ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর প্রবেশমুখ ধ্বংস করে দেওয়া হলেও সাধারণ নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করে সেগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে তেহরান। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোকে অকার্যকর করতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালায়। হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথ, যোগাযোগ সড়ক এবং উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলো। এতে সাময়িকভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশটির সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরানের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে বুলডোজার, ফ্রন্ট-এন্ড লোডার ও ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। বোমার আঘাতে সৃষ্ট বড় বড় গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি কিছু এলাকায় নতুন করে পাকা সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভারী সামরিক যানবাহন চলাচল করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার সময় সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলেও ভূগর্ভস্থ মূল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের বড় অংশ অক্ষত ছিল। কারণ এসব স্থাপনা বহু বছর ধরে গভীর পাহাড়ি ও পাথুরে অঞ্চলের নিচে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ভূপৃষ্ঠে চালানো হামলা সরাসরি অস্ত্রভান্ডারে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেনি।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার বলেছেন, সংঘাত পুনরায় শুরু হলে ইরান এখনো দীর্ঘ সময় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ চালিয়ে যেতে সক্ষম। তাঁর মতে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও বিদ্যমান মজুত অস্ত্র এবং লঞ্চার ব্যবহার করে ইরান উল্লেখযোগ্য সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের হাতে এখনো বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং এগুলো ব্যবহারে কার্যকর কোনো বড় বাধা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না। হামলার পর দ্রুত পুনরুদ্ধার কার্যক্রমই প্রমাণ করে যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির অন্তত ৬৯টি প্রবেশমুখে হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে অধিকাংশই ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পুনরায় প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সামরিক যান চলাচলের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক তৈমুর কাদেশেভের মতে, ইরান প্রায় দুই দশক ধরে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তাই শুধু প্রবেশপথ ধ্বংস করলেই তাদের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো, জ্বালানি কারখানা এবং প্রযুক্তিগত সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও হামলা চালিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্থাপনা ইতোমধ্যে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের কার্যক্রমও ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হচ্ছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত পুনরুদ্ধার করছে। বিশেষ করে ড্রোন উৎপাদন, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং কিছু উৎপাদন সক্ষমতা ইতোমধ্যে আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করে অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ প্রকৌশল সরঞ্জাম দিয়েই দ্রুত সেই ক্ষতি মেরামত করা যায়। ফলে সামরিক হামলার তাৎক্ষণিক সাফল্য সব সময় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সাফল্যে পরিণত হয় না।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি ভবিষ্যতে আবার সংঘাত শুরু হয়, তবে পুনরুদ্ধার করা এই ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো ইরানকে নতুন করে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—শুধু অবকাঠামো ধ্বংস করলেই কি একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা নিঃশেষ করা সম্ভব?
ট্যাগ:
ইরান, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সামরিক হামলা, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, যুদ্ধবিরতি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট ছবি, সামরিক বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, তেহরান, হরমুজ প্রণালি