দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ বরিশালে এইচআইভি (এইডস) সংক্রমণের হার ক্রমেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালভিত্তিক পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন করে শনাক্ত হওয়া এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ও শিক্ষার্থী রয়েছেন। এ পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তারা বলছেন, সচেতনতার অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অনাগ্রহ সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি মানুষের রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জনের শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জনই শিক্ষার্থী। চিকিৎসকদের মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংক্রমণের এই হার ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুধু গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেই ২০৪ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১১ জনের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা সংক্রমণের বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, শনাক্ত হওয়া বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌনসম্পর্কে জড়িত থাকার বিষয়টি অনেক রোগীর ক্ষেত্রে উঠে এসেছে। একইসঙ্গে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির স্ত্রীর শরীরেও সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কারণ এর মাধ্যমে পারিবারিক পর্যায়েও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. জসিম উদ্দিন জানান, সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ রোগীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মাশরুর বিন আজাদ বলেন, আগে বরিশাল অঞ্চলে এইচআইভি সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে বর্তমানে পরীক্ষার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশের বয়স ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি সংক্রমণ হঠাৎ করে বৃদ্ধি পায় না। এটি দীর্ঘ সময় ধরে সমাজে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও দীর্ঘদিন বিষয়টি বুঝতে পারেন না। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল অঞ্চলে কয়েক হাজার মানুষ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিরাপদ আচরণ, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, শুধু বরিশাল নয়, দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে পরীক্ষার সুবিধা সহজলভ্য করতে হবে যাতে মানুষ ভয় বা সংকোচ ছাড়াই পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত হন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে। তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্তদের জন্য কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। সময়মতো শনাক্ত হলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক কুসংস্কার ও লজ্জা কাটিয়ে স্বাস্থ্যসচেতন আচরণ গড়ে তোলাই হতে পারে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অন্যথায় ভবিষ্যতে এই সংক্রমণ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
# ট্যাগ:
এইচআইভি, এইডস, বরিশাল, স্বাস্থ্য সংবাদ, এইচআইভি সংক্রমণ, শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজ, জনস্বাস্থ্য, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্বাস্থ্য সচেতনতা, রোগ প্রতিরোধ, বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাত, এইডস প্রতিরোধ, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ঝুঁকি