সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এখন থইথই পানিতে ভরা। কয়েক সপ্তাহ আগে যেখানে সোনালি ধানে ভরে উঠেছিল মাঠ, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানির নিচে ডুবে থাকা নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসলের স্মৃতি। তবুও হাল ছাড়েননি কিছু কৃষক। রোদ উঠলেই তাঁরা নৌকা নিয়ে নামছেন হাওরে, পানির নিচে ডুবে থাকা ধান উদ্ধারের শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন। স্থানীয় ভাষায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘আকি’ দেওয়া—এক ধরনের বিশেষ কৌশল, যার মাধ্যমে পানির নিচে ডুব দিয়ে দলা পাকানো ধান টেনে তুলে নৌকায় আনা হয়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের মদনপুর, গোবিন্দপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো দেখা যাচ্ছে কৃষকদের এই সংগ্রাম। পানির নিচে ১৫ থেকে ২০ দিন ডুবে থাকা ধান উদ্ধার করে এনে শুকানো, মাড়াই করা এবং যা কিছু অবশিষ্ট থাকে তা ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তবে এই ধান থেকে ইতোমধ্যে পচা গন্ধ বের হচ্ছে, ফলে এর গুণগত মানও অনেক কমে গেছে।
কৃষকদের ভাষ্যমতে, পানির নিচে থাকা ধান তুলতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। বাঁশের তৈরি বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে পানির তলা থেকে ধান টেনে তোলা হয়। সারাদিন পরিশ্রম করেও এক বা দুই নৌকার বেশি ধান উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। পরে হাওরপাড়ে এনে গরু দিয়ে মাড়াই করতে হয়। কারণ পানিতে পচে যাওয়া ধান মেশিনে মাড়াই করা প্রায় অসম্ভব। যেসব কৃষকের গরু নেই, তাঁরা নিজেরাই পা দিয়ে ধান মাড়াই করেন।
কৃষকেরা জানান, এক বিঘা জমি থেকে এভাবে উদ্ধার করা ধান থেকে মাত্র চার থেকে পাঁচ মণ ফসল পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই উদ্ধারকৃত ধানের পরিমাণ এত কম যে তা তুলতে গিয়ে খরচই বেশি পড়ে। ফলে অনেক কৃষক পানির নিচে পড়ে থাকা ধান আর তুলতে যান না। বিশেষ করে যাঁদের নিজস্ব নৌকা নেই বা শ্রমিক ভাড়া করতে হয়, তাঁদের জন্য এই কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
গোবিন্দপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক নূর মিয়ার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মৌসুমগুলোর একটি কাটছে এবার। তাঁর ১৮ বিঘা জমির মধ্যে ১১ বিঘার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাকি জমি থেকে কোনোভাবে ৪৫ মণ ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। তিনি জানান, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলের কারণে তাঁর ফসল তলিয়ে যায়। সেই সময় শ্রমিক সংকট এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে জমির ধান কাটাও সম্ভব হয়নি।
এখন তিনি আরেক কৃষকের সঙ্গে মিলে একটি ছোট নৌকা কিনে ডুবে থাকা ধান উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর মতে, এই ধান অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি লাভজনক নয়। বরং এটি মানসিক সান্ত্বনার বিষয়। বছরের পর বছর পরিশ্রম করে ফলানো ফসলের অন্তত কিছু অংশ ঘরে তুলতে পারার চেষ্টা মাত্র।
একই ধরনের কষ্টের কথা জানিয়েছেন কৃষক খোয়াজ আলী। তাঁর ভাষায়, এবারের মতো দুর্ভোগ আগে কখনো দেখেননি। প্রথমে জলাবদ্ধতায় কিছু ধান নষ্ট হয়েছে, পরে কাটা ধান বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা যায়নি। এরপর উজানের ঢলে পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যায়। ফলে অনেক কৃষক ধান কাটার পরও গোলায় তুলতে পারেননি।
হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা জানান, ফসলহানির কারণে তাঁদের এবারের ঈদ ছিল একেবারেই নিরানন্দ। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেয়েছে। কৃষিই যাঁদের একমাত্র জীবিকা, তাঁদের জন্য এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিকভাবেও বড় আঘাত।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ টন। এর মধ্যে গত মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত মোট আবাদি জমির প্রায় ৯০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে কৃষি বিভাগ স্বীকার করেছে যে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর হলেও স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই কাটা ধান খলায় নষ্ট হয়েছে, যা সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে গেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এ মৌসুমে হাওরাঞ্চলে ফসলহানির কারণে অন্তত ১ লাখ ২৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো প্রস্তুত হয়নি এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং উজানের ঢল হাওরাঞ্চলের কৃষিকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিবছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ফলে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং কৃষকদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা কর্মসূচি জরুরি হয়ে উঠেছে।
হাওরের পানির নিচ থেকে পচে যাওয়া ধান তুলে আনার এই দৃশ্য শুধু একটি ফসল বাঁচানোর চেষ্টা নয়; এটি হাজারো কৃষক পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, হতাশার মধ্যেও আশাকে ধরে রাখার এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি।
ট্যাগ:
সুনামগঞ্জ, হাওর, বোরো ধান, কৃষক, ফসলহানি, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, কৃষি সংকট, হাওরাঞ্চল, ধান উদ্ধার, আকি দেওয়া, কৃষি সংবাদ, গ্রামীণ অর্থনীতি, বাংলাদেশ কৃষি