বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন জাতীয় বাজেট ঘিরে ইতোমধ্যে নানা আভাস ও সম্ভাব্য রূপরেখা সামনে এসেছে। অর্থমন্ত্রী ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, এবারের বাজেটের মূল উন্নয়নদর্শন হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে “মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন”। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইতিবাচক দিক হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বিভিন্ন খাতের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে প্রণীত হতে যাওয়া এই বাজেটে একদিকে কৃচ্ছ্রসাধনের বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি অব্যাহত রাখার ইঙ্গিতকে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে ভর্তুকি কমানো হলে জনজীবনে আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং কৃষি উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তবে বাজেটের কিছু লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যদিও বর্তমানে দেশের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের কিছু বেশি। একইভাবে বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও বেশ উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামাজিক সুরক্ষাবলয় সম্প্রসারণ এবারের বাজেটের অন্যতম বড় দিক হিসেবে উঠে এসেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪৮ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির জন্য আগামী বাজেটে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গঠনের কথাও বলা হচ্ছে, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে সম্ভাব্য বাজেটে। বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও মানবিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়ার আভাস মিলেছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিনির্ভরতার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং আনন্দমুখর শিক্ষাব্যবস্থা গঠনের বিষয়গুলো বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সবার জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও নতুন উদ্যোগের কথা আলোচিত হচ্ছে।
কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখার অংশ হিসেবে কৃষক কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে এবং হাজারো কৃষক এর সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা, বৃক্ষরোপণ, তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
তবে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো দিকনির্দেশনা সামনে আসেনি। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণ সুবিধার মতো বিষয়গুলো বাজেট আলোচনায় তুলনামূলক কম গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেটে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষাও থাকবে। অর্থনৈতিক চাপ সামলে মানবকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ট্যাগ:
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭, বাংলাদেশ বাজেট, অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা, ফ্যামিলি কার্ড, মূল্যস্ফীতি, কৃষক কার্ড, বাজেট বিশ্লেষণ, মানবকল্যাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি