ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় নানা অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৯ কোটি টাকা মূল্যের একটি ক্যাথল্যাব যন্ত্র দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে চালু না থাকার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এর সম্পূর্ণ বিল পরিশোধের তথ্য পেয়েছে দুদকের দল। সরকারি অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম এবং চিকিৎসাসেবার জন্য কেনা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত না করার বিষয়টি এ ঘটনায় সামনে এসেছে।
ক্যাথল্যাব কেন গুরুত্বপূর্ণ
ক্যাথল্যাব বা ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাবরেটরি হৃদ্রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা। হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লক শনাক্ত করা, এনজিওগ্রাম করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এনজিওপ্লাস্টির মতো চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পন্ন করতে এ ধরনের যন্ত্রপাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল, উপযুক্ত অবকাঠামো এবং কারিগরি সহায়তা থাকলে ক্যাথল্যাবের মাধ্যমে রোগীদের বিশেষায়িত হৃদ্রোগের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
এ ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপন ও পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। ফলে সরকারি অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে স্থাপন, কার্যকর করা এবং রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্র কেনার পর দীর্ঘ সময় তা চালু না থাকলে প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
দুদকের অভিযানে উঠে এসেছে যে তথ্য
দুদকের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৯ কোটি টাকা মূল্যের ক্যাথল্যাব যন্ত্রটি প্রায় এক দশক ধরে চালু করা হয়নি। অথচ যন্ত্রটি সরবরাহ বা সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা এবং কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে যন্ত্রটি ব্যবহার উপযোগী কি না এবং নির্ধারিত সেবা দিতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ক্যাথল্যাবটি দীর্ঘ সময় চালু না থাকার পরও পুরো বিল পরিশোধের বিষয়টি তাই দুদকের অনুসন্ধানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে যন্ত্রটি কেন চালু করা যায়নি, এর পেছনে কারিগরি সমস্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবলসংকট কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা প্রাথমিক তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে দায় নির্ধারণ করা হয়েছে—এমন তথ্যও দেওয়া হয়নি।
সরকারি অর্থ ব্যয় ও জবাবদিহির প্রশ্ন
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। হাসপাতালের জন্য কেনা মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে রোগীরা সম্ভাব্য বিশেষায়িত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি কেনা, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না, সেটিও পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
দুদকের অভিযান ও প্রাথমিক তদন্তের মাধ্যমে এ ধরনের অভিযোগের তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তে ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র, চুক্তির শর্ত, বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া এবং যন্ত্রটি চালু না হওয়ার কারণ পর্যালোচনা করা হতে পারে। তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাথল্যাব কেন প্রায় ১০ বছরেও চালু হয়নি এবং যন্ত্রটি কার্যকর না করেই কীভাবে পুরো বিল পরিশোধ করা হলো—এ দুটি বিষয় এ ঘটনায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী অনুসন্ধান ও যাচাইয়ের ফলাফলের ওপরই সংশ্লিষ্টদের দায় এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ভর করবে।