দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক দফা বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তেল-ডিজেলের দাম কেন এত বাড়ছে? বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সরাসরি পড়ে। সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। একই সময়ে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দামও লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। তবে অক্টোবর মাসে নতুন করে দাম বাড়ানো হয়নি; সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত দামই বহাল রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজার অনেকটাই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, মার্চের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং একই সময়ে পরিবহন ও জাহাজভাড়া বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমদানির খরচ। বিদেশ থেকে জ্বালানি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে দেশের জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসান
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানও একটি বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি বিক্রি করে বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সেপ্টেম্বরের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে এই লোকসান কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করলে বিপিসির ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তা কমাতেই মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিপিসির লোকসান উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি
দাম বাড়ানোর পেছনে সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথাও সরকার উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশী কোনো দেশে একই জ্বালানির দাম বেশি হলে দেশের অভ্যন্তরে কম দামে বিক্রি হওয়া জ্বালানি সীমান্ত দিয়ে পাচারের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে দেশের বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ পড়ার পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক মূল্য সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশে নির্দিষ্ট সময় পর তা সমন্বয় করা এবং দাম কমলে তার প্রভাবও দেশের বাজারে প্রতিফলিত করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার মূল্য সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা। পরে এপ্রিল, জুন এবং সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরের মূল্যবৃদ্ধির পর ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অক্টোবরেও এসব দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
কেন ডিজেলের দাম নিয়ে বেশি আলোচনা?
ডিজেল শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনে ব্যবহৃত হয় না; পরিবহন, কৃষি, পণ্য সরবরাহ ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে সরাসরি শুধু জ্বালানি খরচই বাড়ে না, এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে। পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে ব্যবসা ও শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামনে মূল প্রশ্ন কী?
তেল-ডিজেলের দাম বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয়, বিপিসির লোকসান, পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির মতো একাধিক বিষয় কাজ করছে। তবে দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ ভোক্তা, পরিবহন খাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর যে বাড়তি ব্যয় তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাই জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার পাশাপাশি দেশের বাজার, বিপিসির আর্থিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি; বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।