ফুটবল ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা গেছে। বয়স যখন ৩৯-এর দোরগোড়ায়, তখন অধিকাংশ ফুটবলারের ক্যারিয়ার শেষের পথে থাকে। কিন্তু Lionel Messi যেন ব্যতিক্রমের আরেক নাম। সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি এখনও বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে তার পারফরম্যান্স দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি প্রায় চার দশকের জীবনে পা রেখেছেন।
২৩ জুন নিজের জন্মদিন উদযাপন করেছেন মেসি। বয়স বেড়েছে, কিন্তু কমেনি তার ক্ষুধা, সৃজনশীলতা কিংবা খেলার প্রতি নিবেদন। বরং অনেকের মতে, কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বকাপ জয়ের পরও তিনি আরও পরিণত ও কার্যকর ফুটবল খেলছেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলা, আক্রমণ সাজানো এবং গোল করার অসাধারণ দক্ষতা এখনও তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন মেসি। এই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮-তে। একই সঙ্গে টুর্নামেন্টে মাত্র দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে নিজের দুর্দান্ত ফর্মের জানান দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে। যেমন ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে Diego Maradonaর বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আজও আলোচনার বিষয়। তেমনি ২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসির পারফরম্যান্স ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আর্জেন্টাইন সাংবাদিক Sergio Levinsky দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের খুব কাছ থেকে কাজ করছেন। তার মতে, মেসির বর্তমান সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি, কঠোর শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর যখন সবাই ধারণা করছিলেন তিনি হয়তো ইউরোপ ছেড়ে সৌদি আরবে যাবেন কিংবা বার্সেলোনায় ফিরবেন, তখন সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি যোগ দেন Inter Miami CF-এ।
লেভিনস্কির দাবি, ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখেই মেসি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। জাতীয় দলের কোচ Lionel Scaloniর সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখার পরিকল্পনা ছিল তার। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তির সময়ও তিনি কিছু বিশেষ শর্ত দিয়েছিলেন, যা তার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশ ছিল বলে জানা যায়।
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখা হয় তার শৃঙ্খলাবোধকে। মাঠে প্রতিপক্ষের কঠিন ট্যাকলের শিকার হলেও খুব কম সময়ই তাকে উত্তেজিত হতে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও বিতর্ক এড়িয়ে চলেছেন। পরিবার, বন্ধু এবং ফুটবল—এই তিন বিষয়কে ঘিরেই তার জীবন আবর্তিত হয়েছে।
অনেকেই মেসির সঙ্গে মারাদোনার তুলনা করেন। প্রতিভার বিচারে মারাদোনা ছিলেন অসাধারণ, তবে সাফল্য, ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বিচারে মেসির অবস্থান আরও সমৃদ্ধ বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সার্জিও লেভিনস্কির ভাষায়, মারাদোনা ফুটবলের বাইরেও নানা বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন, আর মেসি বরাবরই নিজেকে ফুটবল ও পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
ফুটবলের ইতিহাসে অসংখ্য তারকা এসেছেন, আবার হারিয়েও গেছেন। কিন্তু মেসি এমন এক নাম, যিনি প্রতিটি প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছেন নিজের প্রতিভা, বিনয় এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি প্রমাণ করে চলেছেন, প্রকৃত কিংবদন্তিদের জন্য বয়স কখনোই বাধা নয়।