সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর আদালতে দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজধানীর একটি হত্যাচেষ্টা মামলার শুনানিতে তিনি দাবি করেছেন, কারাগারে অবস্থানকালে তার বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন মামলার তথ্য, আদালতের কার্যক্রম এবং আইনজীবীদের বক্তব্য দুটি পৃথক খাতায় সংরক্ষণ করছেন। আদালতে দেওয়া এই বক্তব্যকে ঘিরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আইন অঙ্গনে ভিন্নমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বংশাল থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আদালতে উপস্থিত হয়ে হাসানুল হক ইনু নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পান। শুনানিকালে তিনি বলেন, কারাগারে তিনি দুটি খাতা ব্যবহার করছেন, যার একটি লাল এবং অন্যটি সবুজ রঙের। এসব খাতায় তিনি তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অগ্রগতি, আদালতের বিভিন্ন আদেশ এবং শুনানিতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থাপিত বক্তব্য লিখে রাখছেন।
তার এই মন্তব্য আদালত কক্ষে উপস্থিত আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তাৎক্ষণিক আলোচনার জন্ম দেয়। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন এবং জানান, আসামির বক্তব্য থেকে বোঝা যায় তিনি মামলাগুলোর বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করছেন। এর পরপরই বিষয়টি নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী মনে করেন, বিচারাধীন বিষয়ে এ ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যতে আদালতের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক বা প্রশ্ন তৈরির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাদের কেউ কেউ মন্তব্য করেন, আদালতের কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশেষভাবে নথিভুক্ত করার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপরই নির্ভর করবে।
অন্যদিকে আইন অঙ্গনের একটি অংশের মতে, কোনো ব্যক্তি নিজের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ করলে তা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক মামলার মুখোমুখি হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের আইনি অবস্থান বুঝতে নোট সংরক্ষণ করতেই পারেন। ফলে বিষয়টি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি না, তা বিচারিক বিশ্লেষণের বিষয়।
শুনানির সময় হাসানুল হক ইনু কারাগারের হাজতখানায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ার অভিযোগও তোলেন। পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রমের কিছু বিষয় নিয়ে তিনি সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন বলে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব বক্তব্যও পরবর্তীতে আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
একই দিনে সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকেও আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন উপস্থাপন করে এবং মামলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। আদালতের অনুমতি নিয়ে রাশেদ খান মেননও নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
শুনানি শেষে আদালত উভয় নেতাকে সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। তবে হাসানুল হক ইনুর বক্তব্য আদালত অবমাননার শামিল হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় আদেশ দেওয়া হতে পারে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় একটি মিছিল চলাকালে মো. মোখলেছিন নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পর তিনি বংশাল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো এবং সেগুলোর বিচারিক অগ্রগতি জনমনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যেই হাসানুল হক ইনুর ‘লাল-সবুজ খাতা’ প্রসঙ্গ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতে দেওয়া কোনো বক্তব্য আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি না, তা নির্ধারণে বক্তব্যের ভাষা, উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এ বিষয়ে আদালতের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর রয়েছে।
**ট্যাগ:**
হাসানুল হক ইনু, জাসদ, আদালত, আদালত অবমাননা, বংশাল থানা, হত্যাচেষ্টা মামলা, রাশেদ খান মেনন, ঢাকার আদালত, বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক মামলা, কারাগার, আইন ও আদালত, গ্রেপ্তার দেখানো, আদালত শুনানি, বাংলাদেশ রাজনীতি