Loading...

  • 26 Jul, 2026

কর্মক্ষেত্রে শিশুশ্রমিকদের ওপর নির্যাতন উদ্বেগজনক, মারধর থেকে যৌন হয়রানি—বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে হাজারো শিশু

কর্মক্ষেত্রে শিশুশ্রমিকদের ওপর নির্যাতন উদ্বেগজনক, মারধর থেকে যৌন হয়রানি—বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে হাজারো শিশু

দেশে শিশুশ্রম এখনও একটি বড় সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত শিশুদের অনেকেই শারীরিক নির্যাতন, শ্রমশোষণ, মজুরি বঞ্চনা, যৌন হয়রানি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় খাতেই কর্মরত শিশুরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হলেও অধিকাংশ ঘটনাই থেকে যাচ্ছে আড়ালে।

সরকার পরিচালিত শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এর তথ্য অনুযায়ী, শিশুশ্রম সংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে অন্যতম উদ্বেগজনক বিষয় হলো ‘বন্ধকি শিশুশ্রম’। এমন অনেক ঘটনায় দেখা যায়, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অভিভাবকরা সন্তানকে পাওনাদারের কাছে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করছেন। এছাড়া শ্রম নিয়ে পারিশ্রমিক না দেওয়া, গৃহস্থালি কাজে শিশুশ্রম, কর্মস্থলে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে কাজে নিয়োগের মতো অভিযোগও নিয়মিত আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের ১০ তারিখ পর্যন্ত এ ধরনের ১০১টি অভিযোগ পেয়েছে হেল্পলাইনটি। একই সময়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কর্মক্ষেত্রে শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত ৩৩টি কল এসেছে।

রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও কমলাপুর রেলস্টেশনের মতো জায়গায় শিশু কুলিরা প্রতিদিনই প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়। কাজ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় তাদের ধাক্কা দেওয়া, মারধর করা কিংবা কাজ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিত। শিশু শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় শ্রমিকরা প্রায়ই তাদের চড়-থাপ্পড় দিয়ে পেছনে সরিয়ে দেন, ফলে তারা আয় থেকেও বঞ্চিত হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ পরিচালিত ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’ অনুযায়ী, শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের ৩১ শতাংশ কাজ করতে গিয়ে আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ শিশু কাটাছেঁড়া বা শারীরিক আঘাতের শিকার হয়েছে। এছাড়া ভারী বোঝা বহনের কারণে হাড় ভাঙা, কোমর ও পিঠে ব্যথা, দগ্ধ হওয়া এবং মারধরের মতো ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে ঘটছে।

গৃহশ্রমিক জাতীয় ফোরাম বাংলাদেশের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা বলেন, গৃহশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আলোচিত কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনা অজানাই থেকে যায়। দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সেই অনেক শিশু গৃহকর্মে যুক্ত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কর্মস্থলে সহিংসতার কারণে ২০ জন শিশুশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় গৃহশ্রমে নিয়োজিত প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার এবং ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ অতিরিক্ত কাজের চাপ বহন করছে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ইটভাটা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শিশুরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য পারিশ্রমিক পায় না। পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতন, অপমান এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়। প্রতিবাদ করার সক্ষমতা কম থাকায় অনেক নিয়োগকর্তাই শিশুদের কাজে নিতে আগ্রহী হন।

যদিও জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০-এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ এবং শিশুদের কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবে এর যথাযথ প্রয়োগ এখনও নিশ্চিত হয়নি। কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অনেক শিশু পারিশ্রমিক ছাড়াই শিক্ষানবিশ বা সাগরেদ হিসেবে কাজ করছে। ভুল হলে তাদের শারীরিক শাস্তির মুখোমুখিও হতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রম বন্ধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। শ্রম সংস্কার কমিশন গৃহকর্মে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিদর্শন সংস্থার সমন্বয়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে শিশুশ্রম থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।