সারা দেশে চলাচলকারী স্লিপার বাসের বৈধতা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে রাজধানীর বনানীতে সড়ক অবরোধ করেছেন বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির নেতাকর্মীরা। রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুর ১টা ১০ মিনিটের দিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সদর দপ্তরের সামনের সড়ক বন্ধ করে অবস্থান নেন তারা। এতে বনানী থেকে মহাখালীগামী যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং ওই পথে চলাচলকারী যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
স্লিপার বাস মালিক সমিতির নেতারা জানান, আধুনিক ও আরামদায়ক এই পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্লিপার বাস পরিচালনার ক্ষেত্রে বৈধতা, ফিটনেস, রুট পারমিটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি স্লিপার বাস পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এর আগে সমিতির নেতারা সাংবাদিকদের কাছে তাদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। পরে বিআরটিএ কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিতে সমিতির সভাপতি আফতাব উদ্দিন মাসুদ, সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবুসহ কয়েকজন নেতা সেখানে যান। তাদের দাবি, বিষয়টির স্থায়ী সমাধানে বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সমিতির নেতারা বলেন, স্লিপার বাস চলাচল নিয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং-১২৯০/২০২৫ বিচারাধীন রয়েছে। তাই আদালতে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ, নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের অন্যতম দাবি হলো, আদালতের বিচারাধীন বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্লিপার বাস মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া। পাশাপাশি ফিটনেস ও রুট পারমিটসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধান এবং আইনি প্রক্রিয়া চলাকালে অযৌক্তিক জরিমানা, তল্লাশি ও গাড়ি আটক বন্ধেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
মালিক সমিতির নেতাদের ভাষ্য, স্লিপার বাস খাতে ইতোমধ্যে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই পরিবহনসেবার সঙ্গে চালক, হেলপার, সুপারভাইজার, মেকানিকসহ হাজার হাজার মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বা সুস্পষ্ট নীতিমালা ছাড়াই স্লিপার বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হলে মালিকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিকও আর্থিক সংকটে পড়বেন।
তারা আরও বলেন, স্লিপার বাস বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে এর কারিগরি বৈশিষ্ট্য, যাত্রী নিরাপত্তা, যানবাহনের কাঠামো এবং পরিচালনব্যবস্থা বিবেচনা করে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব মানদণ্ড অনুসরণ করে স্লিপার কোচ পরিচালিত হয়, সেগুলো পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা করা যেতে পারে।
সমিতির নেতারা দাবি করেন, তারা আইন ও সরকারি বিধিবিধান মেনে চলতে প্রস্তুত। তবে নতুন ধরনের এই পরিবহনসেবাকে পুরোপুরি বন্ধ না করে মালিক, শ্রমিক, বিআরটিএ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে একটি স্থায়ী সমাধান বের করা উচিত।
তাদের মতে, দেশের দীর্ঘপথের যাত্রী পরিবহনে স্লিপার বাসের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের যাত্রায় যাত্রীদের তুলনামূলক আরাম ও বিশ্রামের সুযোগ দেওয়ার কারণে এসব বাস জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে এই পরিবহনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনে নিরাপদভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
এদিকে সড়ক অবরোধের কারণে বনানী ও আশপাশের এলাকায় যানবাহন চলাচলে প্রভাব পড়ে। বনানী থেকে মহাখালী অভিমুখী যাত্রীরা বিশেষ করে দুর্ভোগে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ডিএমপির ট্রাফিক মহাখালী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার ইশরাকুল কবীর বলেন, স্লিপার কোচের মালিক ও কর্মচারীরা বাস পরিচালনার অনুমোদনের দাবিতে বনানী সেতু ভবনের সামনের সড়কে আন্দোলন করছেন। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
স্লিপার বাস নিয়ে মালিক সমিতির আন্দোলন এমন সময়ে হলো, যখন দেশে আন্তঃনগর ও দূরপাল্লার গণপরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের দাবি জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন প্রযুক্তি ও পরিবহনব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি যাত্রী নিরাপত্তা, যানবাহনের কারিগরি মান এবং আইনগত কাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি। তাই চলমান বিরোধ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে স্লিপার বাস পরিচালনার জন্য একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।