আগামী ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে আলোচনা চলছে এবং এই সময়ের মধ্যেই সফরের নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হতে পারে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। সম্ভাব্য এই সফরকে দুই দেশের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন কমিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন গতিতে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ২০-২১ আগস্ট অথবা ২১-২২ আগস্ট—এই দুই সময়সীমার একটি সফরের জন্য বিবেচনায় রয়েছে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্বে ফেরার পর সফরের সময়সূচি আরও স্পষ্ট হতে পারে। তিনি গত ১০ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরদিন ১১ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এসব বৈঠকের পরই প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের খবর প্রকাশিত হয়েছে। নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, দুই দেশই দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়ে আগ্রহী ছিল। তবে উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যস্ত সময়সূচির কারণে সফরের তারিখ নির্ধারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়। এখন ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে একটি তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে দুই পক্ষ অনেকটাই কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
সফরের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন কর্মসূচিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন না—এমন সিদ্ধান্তের পর দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সমঝোতা তৈরি হয়েছে বলে একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
প্রাথমিকভাবে আগস্টের শেষ দিকে সফরের প্রস্তাব দিয়েছিল ঢাকা। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেপ্টেম্বরের শুরুতে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সম্ভাব্য কর্মসূচির কারণে নয়াদিল্লি সময়সূচি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছিল। একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে সেপ্টেম্বরের শুরুতে নিউইয়র্কে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আগস্টের ২০ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে সফর আয়োজনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া। এরপর তিনি চীন সফর করেন। এবার ভারত সফর হলে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে নানা ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকা এর আগে নয়াদিল্লির কাছে অনুরোধ করেছিল, ভারতের মাটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে যেন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়।
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এর ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে এই রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রভাব থাকতে পারে।
এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, ঢাকা চায় ভারত যেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
গত ১০ আগস্ট নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগে ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই দিনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এরপর ১১ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন ত্রিবেদী। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈঠকের একটি ছবি প্রকাশ করে জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও কীভাবে উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা নিতে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
এর আগে গত ৩১ জুলাই ঢাকায় সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ প্রেসিডেন্ট দূত সার্জিও গরের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন দিনেশ ত্রিবেদী। এসব ধারাবাহিক বৈঠকের ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভারত সরকার তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচির কারণে সেই সফর এতদিন অনুষ্ঠিত হয়নি। এবার সফরের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণের আলোচনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের এক সাবেক কূটনীতিকের মতে, সম্ভাব্য ভারত সফর শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের জন্য নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ভারতের জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কানেকটিভিটি ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পানি বণ্টনও সম্ভাব্য আলোচনার একটি বড় বিষয় হতে পারে। আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিও এখনো অমীমাংসিত। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি ও যোগাযোগের মতো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিষয়গুলোতে দুই দেশ সমঝোতার পথ খুঁজতে পারে। সম্ভাব্য এই সফর তাই শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য সফর নয়, বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সফরের চূড়ান্ত তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ঢাকা ও নয়াদিল্লির আলোচনার পরই সময়সূচি চূড়ান্ত হবে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।