বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের হয়রানি ও অনিয়ম কমাতে নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কর্মী নিবন্ধন, চাকরির তথ্য, নিয়োগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য ধাপ ধীরে ধীরে ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর বর্তমান ব্যবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালের সম্পৃক্ততার কারণে অনেক কর্মী অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেন। কেউ কেউ বিদেশে যাওয়ার আগে প্রতারণার শিকার হন, আবার অনেক ক্ষেত্রে চাকরির নামে ভিন্ন ধরনের কাজ বা প্রতিশ্রুত বেতনের চেয়ে কম পারিশ্রমিক পাওয়ার অভিযোগও ওঠে। এসব সমস্যা কমাতে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তির আওতায় আনা জরুরি।
তিনি বলেন, একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য কোথায় আবেদন করবেন, কত টাকা খরচ হবে, কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাবেন, বেতন কত, নিয়োগকর্তা কে এবং তার ভিসা ও অন্যান্য কাগজপত্রের অবস্থা কী—এসব তথ্য যেন অনলাইনে সহজেই জানা যায়, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে কর্মীদের তথ্যের জন্য বিভিন্ন দপ্তর বা ব্যক্তির কাছে বারবার যেতে হবে না।
অনলাইনে পুরো প্রক্রিয়া চালু হলে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য খরচ ও সময়—দুটিই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কোন ধাপে কত টাকা দিতে হবে এবং কোন সেবার জন্য কী ধরনের ফি প্রযোজ্য, সেটিও স্বচ্ছভাবে জানানো সম্ভব হবে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা অনিয়মের সুযোগ কমবে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কর্মীদের নিবন্ধন থেকে শুরু করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন দেশে যান। তাদের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
মন্ত্রী বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং দক্ষ কর্মী তৈরি, উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত এবং কর্মীদের অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে কর্মী যে কাজের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন, তিনি যেন সেই কাজেই নিয়োগ পান এবং চুক্তিতে উল্লেখিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে বিদেশি নিয়োগকর্তা ও বাংলাদেশের কর্মীদের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানও সহজ হবে। একই সঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান বা এজেন্সির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সহজ হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীদের একটি বড় সমস্যা হলো সঠিক তথ্যের অভাব। অনেকেই চাকরির সুযোগ, ভিসা, খরচ, প্রশিক্ষণ কিংবা নিয়োগকর্তার বিষয়ে যাচাই না করেই দালালের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু করেন। ফলে পরে প্রতারণা বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের ঘটনা ঘটে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যাচাইকৃত তথ্য সহজলভ্য হলে কর্মীরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবেন।
সরকার একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে কর্মীদের প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রশিক্ষণ, সনদ ও কর্মীর দক্ষতার তথ্য যুক্ত করা গেলে বিদেশি নিয়োগকর্তাদের কাছেও যোগ্য কর্মী বাছাই সহজ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা গেলে অভিবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই হবে না; এর তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত, অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে কর্মীদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে সহায়তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে তারা দালালনির্ভর না হয়ে সরকারি ও যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। এতে কর্মীদের আর্থিক ক্ষতি ও হয়রানি কমার পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতেও শৃঙ্খলা বাড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া অনলাইনে এলে একই সঙ্গে সরকার, কর্মী, নিয়োগদাতা ও রিক্রুটিং এজেন্সি—সব পক্ষই উপকৃত হতে পারে। কর্মীদের তথ্য ও প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকলে জবাবদিহিও বাড়বে। ফলে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করার সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াকে অনলাইনের আওতায় আনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশগামী কর্মীদের দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত খরচ, হয়রানি ও প্রতারণার ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়ন হয় এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় কর্মীদের জন্য কতটা সহজ ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।