Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টি, নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা

চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টি, নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা

টানা ভারী বৃষ্টিতে আবারও জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। রোববার (১৬ আগস্ট) থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির পর সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও গোড়ালি থেকে হাঁটু, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

সোমবার সকাল থেকে নগরের কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, ফরিদারপাড়া, চকবাজার, আগ্রাবাদ, উত্তর কাট্টলী, দক্ষিণ নালাপাড়া, জামালখান, রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, নিউমার্কেট ও রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও ধীরগতিতে যান চলাচল করলেও অনেক সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।

কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি ছিল আরও দুর্ভোগপূর্ণ। কয়েকটি এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতেও সমস্যায় পড়তে হয়। দক্ষিণ নালাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পথচারীদের পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। জলাবদ্ধতার সুযোগে কিছু রুটে রিকশাভাড়াও কয়েক গুণ বেড়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ভারী বৃষ্টির কারণে নগরের বিভিন্ন সড়কে যানজটও তৈরি হয়। অফিসগামী চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়েন। নিম্নাঞ্চলের অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানের সামনেও পানি জমে যায়। এতে একদিকে যেমন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে ব্যবসায়িক ও দৈনন্দিন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও ভারী বৃষ্টির সময় পুরোনো চিত্র ফিরে আসায় প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পে মোট প্রায় ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পগুলোর বড় অংশের কাজ শেষ হয়েছে। এরপরও ভারী বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পগুলোর বাস্তব সুফল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলাবদ্ধতার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, জোয়ারের পানির চাপ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং খাল-নালা দিয়ে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহিত হতে না পারার মতো কারণও রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সকালে ভারী বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানির চাপও ছিল। এ কারণে কিছু এলাকায় পানি জমেছে। পানি নিষ্কাশনে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কাজ করছেন এবং বৃষ্টি থামলে দ্রুত পানি নেমে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে নগরের জলাবদ্ধ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের একটি নগর সমস্যা। প্রতি বর্ষায় ভারী বৃষ্টির পর একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসীর মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, খাল-নালা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, পানি প্রবাহের পথ দখলমুক্ত করা, প্রকল্পগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

সোমবারের ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত আবারও দেখিয়ে দিল, ভারী বর্ষণ মোকাবিলায় চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো বড় পরীক্ষার মুখে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, চলমান প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।