চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট জনজীবন, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আবাসিক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে গভীর রাতে কিংবা বিকেলে রান্না করছেন, আবার অনেকে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
একই সঙ্গে সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। গ্যাসের স্বল্পতার কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বিশেষ করে সার কারখানা, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন ও সময়মতো পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জানিয়েছে, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক—সব খাতেই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
গ্যাসের অভাবে বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকরাও। নগরীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক চালক খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছেন। এতে পরিবহন ব্যবস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। শিল্প-কারখানাগুলো একদিকে গ্যাস সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে দ্বৈত সংকটের মুখে পড়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হলেও বর্তমানে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাশাপাশি জাতীয় চাহিদা মেটাতে চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দ গ্যাসের একটি অংশ রাজধানী ঢাকার দিকে সরিয়ে নেওয়ায় স্থানীয় সংকট আরও বেড়েছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হলেও প্রেসার ও ফ্লো কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।