Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

দেশীয় এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোটপক্সের ভ্যাকসিন যাচ্ছে খামারি পর্যায়ে

দেশীয় এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোটপক্সের ভ্যাকসিন যাচ্ছে খামারি পর্যায়ে

এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোটপক্সের জন্য দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত এই দুটি ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক উৎপাদন ও দেশের বিভিন্ন খামারে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর ফলে দেশের পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতে রোগ নিয়ন্ত্রণে দেশীয় গবেষণা ও প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভ্যাকসিন দুটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বিএলআরআই উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোটপক্সের ভ্যাকসিন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে। দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত এসব ভ্যাকসিন দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী বলেন, প্রাণিসম্পদ খাত দেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক খামারি, উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ সরাসরি যুক্ত। গবাদিপশু ও পোলট্রিতে বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়লে খামারিদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগ পোলট্রি খাতের উৎপাদন, খামার ব্যবস্থাপনা এবং বাজারব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভ্যাকসিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা পোলট্রি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ। সংক্রমণের কারণে মুরগি ও অন্যান্য পাখির মধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে খামারিদের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে নিয়মিত রোগ পর্যবেক্ষণ, যথাযথ খামার ব্যবস্থাপনা, জীবাণুনিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে গোটপক্স ছাগলের একটি সংক্রামক রোগ, যা আক্রান্ত প্রাণীর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছাগল পালন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ ধরনের রোগের কার্যকর নিয়ন্ত্রণও খামারি ও পশুপালকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন খামারি পর্যায়ে সহজলভ্য হলে রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, দেশীয় প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে একদিকে রোগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতাও কমবে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন ও প্রাণিস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। দেশের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও প্রাণিসম্পদ খাত উভয়ই লাভবান হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশীয়ভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা কমবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ভ্যাকসিন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাবে। স্থানীয় গবেষণা, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার এই উদ্যোগ দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দেশীয় ভ্যাকসিন খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হলে রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিদেশ থেকে ভ্যাকসিন আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে এসব ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

প্রাণিসম্পদ খাতে রোগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও সরাসরি সম্পর্কিত। পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ থেকে দেশের মানুষের জন্য ডিম, মাংস, দুধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য সরবরাহ করা হয়। রোগের কারণে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং এর ফলে ভোক্তা পর্যায়েও মূল্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। তাই প্রাণিসম্পদের রোগ প্রতিরোধে গবেষণা ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্যাকসিন দুটি উদ্ভাবনের পেছনে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের ভূমিকা রয়েছে। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের মান, কার্যকারিতা, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও খামারি পর্যায়ে সঠিক ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক, বিজ্ঞানী ও গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিকিৎসক, শিল্প উদ্যোক্তা, খামারি প্রতিনিধি এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সব মিলিয়ে, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোটপক্সের দেশীয় ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পোলট্রি ও ছাগল খাতে রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি খামারিদের আর্থিক ঝুঁকি কমানো, উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা এবং ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও টেকসই ও শক্তিশালী করার পথও প্রশস্ত হবে।