Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

এনবিআর ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হচ্ছে: অর্থমন্ত্রী

এনবিআর ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হচ্ছে: অর্থমন্ত্রী

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন করে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, রাজস্ব প্রশাসনে দক্ষতা, জবাবদিহি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এনবিআরের বর্তমান কাঠামো পরিবর্তন করা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় কর নীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসন পরিচালনার কাজ আলাদা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার জন্য এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে করনীতি নির্ধারণ এবং কর আদায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। নতুন কাঠামোতে এই দুই ধরনের কাজ পৃথক করার মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, এনবিআর ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের বিষয়টি সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার অংশ। একটি প্রতিষ্ঠান মূলত করনীতি প্রণয়ন ও নীতিগত বিষয় দেখবে। অন্য প্রতিষ্ঠান কর প্রশাসন, কর আদায় এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য করদাতাদের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করদাতারা যেন সহজে কর দিতে পারেন এবং কর-সংক্রান্ত সেবা পেতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি না হন, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কর প্রশাসনকে আরও সেবামুখী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআরের কাঠামোগত পরিবর্তনের পেছনে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। তাই করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকে নিয়মিত ও সুষ্ঠুভাবে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারের মাধ্যমে কর ফাঁকি, অনিয়ম ও দুর্নীতি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে করদাতাদের সঙ্গে প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ফলে কর জমা দেওয়া, রিটার্ন দাখিল, তথ্য যাচাই এবং অন্যান্য সেবা গ্রহণ আরও সহজ হতে পারে।

বর্তমানে এনবিআরের আওতায় আয়কর, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং শুল্কসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় কর প্রশাসনের কাঠামোকে আরও দক্ষ ও আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে করনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য, বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যবসা-বাণিজ্যের বাস্তবতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বিবেচনা করা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে কর প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান করদাতাদের সেবা, কর আদায়, অডিট ও আইন প্রয়োগের মতো কার্যক্রমে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এনবিআরকে পৃথক প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু কাঠামো পরিবর্তন করলেই হবে না। দুই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও জবাবদিহির সীমারেখা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ব্যবস্থা না থাকলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকতে পারে।

করদাতাদের জন্য সেবার মান উন্নত করাও এই সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্যবসায়ী ও সাধারণ করদাতারা দীর্ঘদিন ধরে কর ব্যবস্থায় জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ করে আসছেন। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে এসব সমস্যা কমিয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা গেলে করদাতাদের আস্থা বাড়তে পারে।

সরকারের রাজস্ব সংস্কারের সঙ্গে ডিজিটালাইজেশনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। করদাতার তথ্যের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, অনলাইনে রিটার্ন দাখিল, ইলেকট্রনিক পেমেন্ট এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালু হলে রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি কর ফাঁকির প্রবণতা শনাক্ত করাও সহজ হতে পারে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকেও পরিবর্তন করতে হবে। একটি আধুনিক অর্থনীতির জন্য কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কর প্রশাসন প্রয়োজন। এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ আরও সহজ হবে বলে আশা করছে সরকার।

সব মিলিয়ে এনবিআরকে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত করার উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। করনীতি ও কর প্রশাসনের দায়িত্ব পৃথক হলে একদিকে নীতিনির্ধারণে আরও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে কর আদায় ও করদাতা সেবায় দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই সংস্কারের সফলতা নির্ভর করবে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব বণ্টন, সমন্বয়, জবাবদিহি এবং বাস্তবায়ন কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে নির্ধারণ করা হয় তার ওপর।