জামালপুরের মাদারগঞ্জে চাচা ও ভাতিজাকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার মামলায় সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় আরও সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—শাখাওয়াত, সোহেল, আলআমিন, সাদ্দাম, অন্তর, উজ্জ্বল ও ফয়জুর। অন্যদিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—চান মিয়া, জিয়ার, শাহ আলম, কাওছার, সুমন, রিফাত ও মোস্তফা। সাজাপ্রাপ্ত সব আসামি এবং মামলার বাদীপক্ষ জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম জানান, পূর্বের একটি বিরোধের জের ধরে ২০১৬ সালের ১৬ মে রাতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ওই রাতে গানবাজনার কথা বলে শাখাওয়াত ও সোহেল নামের দুই আসামি চাচা মহর আলী এবং তাঁর ভাতিজা স্বপন মিয়াকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরে তাদের জোড়খালী ইউনিয়নের কুকুরমারী এলাকার ভানু ফকিরের পাটখেতে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে মহর আলী ও স্বপন মিয়াকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ দুটি ঘটনাস্থলের পাটখেতে ফেলে রাখা হয়। ঘটনার তিন দিন পর স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পাটখেত থেকে দুজনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় নিহত স্বপন মিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে ২০১৬ সালের ১৯ মে মাদারগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মোট ২২ জনকে আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পর পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। পরে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মোট ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালত মামলার নথিপত্র, সাক্ষ্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেন।
বৃহস্পতিবার মামলার রায় ঘোষণার দিন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ মামলার বিচার শেষে আদালত সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায়ের ফলে প্রায় এক দশক আগে সংঘটিত আলোচিত এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো।
মামলার ঘটনায় পূর্ববিরোধের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। স্থানীয় বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, এ ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে হত্যা মামলায় আদালতের রায় ঘোষণার পরও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। ফলে নিম্ন আদালতের রায়ের পর মামলাটি উচ্চ আদালতে গেলে সেখানকার সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে প্রত্যেক আসামির সম্পৃক্ততা, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ বিচার করে আদালত শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করেন। এ মামলাতেও আদালতের রায়ে সাতজনকে সর্বোচ্চ শাস্তি এবং সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে চাচা-ভাতিজা হত্যার এ ঘটনায় দীর্ঘ সময় পর রায় ঘোষণায় নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে। তবে রায়ের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলাটির চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হবে না। এখন উচ্চ আদালতে আপিলসহ পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে নজর থাকবে।