Loading...

  • 28 Jul, 2026

জোনাকির ডিএনএ সংযোজিত উজ্জ্বল উদ্ভিদ: নগর আলোকায়নের ভবিষ্যৎ নাকি জৈবপ্রযুক্তির নতুন বিপ্লব?

জোনাকির ডিএনএ সংযোজিত উজ্জ্বল উদ্ভিদ: নগর আলোকায়নের ভবিষ্যৎ নাকি জৈবপ্রযুক্তির নতুন বিপ্লব?

চীনের একটি বায়োটেক প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি এমন এক প্রযুক্তির প্রদর্শন করেছে, যা ভবিষ্যতের শহরগুলোর চেহারা আমূল বদলে দিতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা জোনাকি পোকার আলো উৎপাদনকারী জিন এবং জৈব-আলোকসজ্জাকারী (bioluminescent) ছত্রাকের জিন উদ্ভিদের কোষে সংযোজন করে ২০টিরও বেশি প্রজাতির উজ্জ্বল উদ্ভিদ তৈরি করেছেন। এসব উদ্ভিদ বাহ্যিক বিদ্যুৎ ছাড়াই নিজে থেকেই মৃদু আলো বিকিরণ করতে সক্ষম।

গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তি একদিন পার্ক, উদ্যান, পথচারী এলাকা কিংবা নগর সবুজায়নের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, যেখানে প্রচলিত বৈদ্যুতিক আলোর প্রয়োজনীয়তা আংশিকভাবে কমে আসবে।

কীভাবে আলো তৈরি করছে উদ্ভিদ?

জীবদেহে আলো উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে বলা হয় *বায়োলুমিনেসেন্স*। জোনাকি পোকার শরীরে "লুসিফেরিন" নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ এবং "লুসিফেরেজ" নামের একটি এনজাইমের পারস্পরিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়ায় অক্সিজেন এবং শক্তি (ATP) অংশগ্রহণ করে এবং ফলস্বরূপ দৃশ্যমান আলো নির্গত হয়।

চীনা গবেষকরা উদ্ভিদের জিনোমে এমন জিন সংযোজন করেছেন, যা উদ্ভিদের কোষে আলো উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক পথ সক্রিয় করে। ফলে গাছপালা রাতের অন্ধকারে নরম, সবুজাভ বা হলদেটে আভা ছড়াতে পারে।

তবে বর্তমান প্রযুক্তিতে উৎপন্ন আলো এখনও একটি নাইটলাইট বা মৃদু আলোকসজ্জার সমতুল্য। এটি রাস্তার বৈদ্যুতিক বাতির মতো উজ্জ্বল নয়।

বহু দশকের গবেষণার ফল

অনেকের কাছে বিষয়টি নতুন মনে হলেও উদ্ভিদে জোনাকির জিন ব্যবহারের গবেষণা শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ এবং ১৯৯০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো ফায়ারফ্লাই লুসিফেরেজ জিন উদ্ভিদে সফলভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হন। সেই সময় গবেষকরা দেখিয়েছিলেন যে জোনাকির আলো উৎপাদনকারী জিন উদ্ভিদের কোষে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এবং উদ্ভিদের জিন-প্রকাশ (gene expression) পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল রিপোর্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

পরবর্তীকালে এই প্রযুক্তি উদ্ভিদের জৈবঘড়ি (circadian rhythm), পরিবেশগত চাপের প্রতিক্রিয়া, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন জিনের কার্যকারিতা অধ্যয়নে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

অর্থাৎ, আজকের আলো ছড়ানো অলংকারমূলক উদ্ভিদের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের মৌলিক উদ্ভিদ-জৈবপ্রযুক্তি গবেষণা।

‘ফায়ারফ্লাই পেটুনিয়া’ থেকে নগর আলোকায়নের স্বপ্ন

২০২৪ সালে বাজারে আসে "ফায়ারফ্লাই পেটুনিয়া" নামে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিত উজ্জ্বল অলংকারিক উদ্ভিদ। যদিও এর আলো তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ এবং মূল্যও বেশ বেশি ছিল, তবুও এটি প্রমাণ করে যে জৈব-আলোকসজ্জাকারী উদ্ভিদ কেবল গবেষণাগারের বিষয় নয়; এগুলো বাণিজ্যিক বাস্তবতায়ও রূপ নিতে পারে।

চীনা গবেষণা দলের লক্ষ্য আরও বড়। তারা জানিয়েছে, তাদের পরিকল্পনা শুধুমাত্র বাড়ির জানালার ধারে রাখা শৌখিন গাছ নয়; বরং পুরো পার্ক, বাগান এবং নগর সবুজ অবকাঠামোকে আলোকিত করার মতো উদ্ভিদভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

যদি এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও আলোর তীব্রতা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি করা যায়, তবে রাতের শহরগুলো অনেকটাই পরিবর্তিত হতে পারে। বৈদ্যুতিক বাতির পরিবর্তে আলোকোজ্জ্বল বৃক্ষ, ঝোপঝাড় এবং ফুলের বাগান নগর নকশার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সম্ভাব্য সুবিধা

বিদ্যুৎ সাশ্রয়

বিশ্বব্যাপী নগর আলোকায়নে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হয়। আংশিকভাবে হলেও জীবন্ত উদ্ভিদ যদি আলো সরবরাহ করতে পারে, তবে শক্তি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব।

কার্বন নিঃসরণ হ্রাস

বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কার্বন নিঃসরণ কমানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

নান্দনিক নগর পরিবেশ

রাতের পার্ক, উদ্যান ও রাস্তার পাশে আলোকোজ্জ্বল উদ্ভিদ শহরকে নতুন এক সৌন্দর্য দিতে পারে, যা পর্যটন ও জনআকর্ষণও বাড়াতে পারে।

জীববৈজ্ঞানিক সেন্সর

ভবিষ্যতে এমন উদ্ভিদ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা দূষণ, বিষাক্ত রাসায়নিক বা রোগজীবাণুর উপস্থিতিতে আলোর রং বা তীব্রতা পরিবর্তন করবে। এতে পরিবেশ পর্যবেক্ষণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগ

তবে প্রযুক্তিটি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে।

পরিবেশগত প্রভাব

জিন-পরিবর্তিত উদ্ভিদ যদি প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী প্রভাব পড়বে তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।

কীটপতঙ্গ ও প্রাণীর আচরণ

অনেক পোকামাকড়, পাখি এবং নিশাচর প্রাণী আলোর প্রতি সংবেদনশীল। দীর্ঘমেয়াদে উজ্জ্বল উদ্ভিদ তাদের আচরণ, খাদ্যাভ্যাস কিংবা প্রজনন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে পারে।

পর্যাপ্ত উজ্জ্বলতা

বর্তমান প্রজন্মের জৈব-আলোকসজ্জাকারী উদ্ভিদ এখনও রাস্তার বাতির বিকল্প হওয়ার মতো শক্তিশালী আলো উৎপাদন করতে পারে না। গবেষকদের সামনে এটি একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

ভবিষ্যতের দিগন্ত

বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের উজ্জ্বল উদ্ভিদ হয়তো আগামী কয়েক দশকের মধ্যে নগর পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। যে প্রযুক্তি একসময় গবেষণাগারে উদ্ভিদের জিন-প্রকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো, সেটিই এখন জীবন্ত আলোর উৎস তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ([University of Edinburgh Research][1])

বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে ভবিষ্যতের শহরগুলো সত্যিই জোনাকির আলো ছড়ানো গাছপালায় আলোকিত হবে কি না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতি প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সীমারেখাকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি ঝাপসা করে দিচ্ছে।

রেফারেন্স:

[1]: https://www.research.ed.ac.uk/en/publications/firefly-luciferase-as-a-reporter-of-regulated-gene-expression-in--2?utm_source=chatgpt.com "Firefly luciferase as a reporter of regulated gene expression in higher plants - University of Edinburgh Research Explorer"
[2]: https://www.researchgate.net/publication/6082437_Transient_and_Stable_Expression_of_the_Firefly_Luciferase_Gene_in_Plant_Cells_and_Transgenic_Plants?utm_source=chatgpt.com "(PDF) Transient and Stable Expression of the Firefly Luciferase Gene in Plant Cells and Transgenic Plants"
[3]: https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC160198/?utm_source=chatgpt.com "A novel circadian phenotype based on firefly luciferase expression in transgenic plants - PMC"


লেখক: আব্দুল্লাহ আল নোমান