কক্সবাজারে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ‘সোনা মিয়া’ পরিচয়ে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির বদলে কারাগারে ছিলেন প্রকৃত সোনা মিয়া। দীর্ঘদিন পর বিষয়টি ধরা পড়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাভোগ করা নিরপরাধ সোনা মিয়াকে অবশেষে মুক্তি দিয়েছে আদালত।
২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। পরে ওই পরিচয়েই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ আসামির সঙ্গে তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হলে পুরো বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।
কারাগারে যাওয়ার পর সোনা মিয়া কর্তৃপক্ষকে জানান, তিনি কোনো মাদক মামলার আসামি নন এবং জীবনে এর আগে কখনো কারাগারে যাননি। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ পুরোনো নথির সঙ্গে তাঁর ছবি, পারিবারিক তথ্য ও অন্যান্য পরিচয় যাচাই করে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখতে পায়। বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে কক্সবাজার সদর থানার পুলিশকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি সোনা মিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তাঁর জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে জামিনে বের হয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান ও প্রকৃত সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে থাকতেন। একপর্যায়ে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কপি রমজানের কাছে থেকে যায়। ওই নথি ব্যবহার করেই রমজান ইয়াবা মামলায় নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
২০২০ সালে গ্রেপ্তার ব্যক্তির কারা নথিতে তাঁর মায়ের নাম, স্ত্রীর নাম, সন্তানসংখ্যা, উচ্চতা, ওজন ও শরীরের শনাক্তকারী চিহ্নের সঙ্গে ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার প্রকৃত সোনা মিয়ার তথ্যের ব্যাপক অমিল পাওয়া যায়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, দুই ব্যক্তি একই ব্যক্তি নন।
এর আগে ২০২২ সালের ১৩ জুন মামলায় ‘সোনা মিয়া’ পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে মামলার রায়ের পর চলতি বছরের ২৩ জুন র্যাব-১৫ তাঁকে ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় প্রকৃত সোনা মিয়াকে।
পুলিশের প্রতিবেদন, মামলার নথি এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। এরপর তাঁকে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে মুক্তির ক্ষেত্রে কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। সোনা মিয়াকে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদেশ যেতে পারবেন না। পাশাপাশি প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে নিজের অবস্থান জানাতে হবে। প্রতি তিন মাস পর তাঁর উপস্থিতি ও অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান জানান, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে বেলা ১১টার দিকে সোনা মিয়াকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, কারাগারে আসার পর সোনা মিয়া জানতে চেয়েছিলেন, কী অপরাধে তাঁকে আটক করা হয়েছে। তাঁকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাদক মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানানো হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরে পুরোনো নথি বের করে ছবি ও পরিচয়গত তথ্যের অমিল পাওয়া যায়। বিষয়টি আদালতকে জানানোর পর তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর নির্দোষিতা নিশ্চিত হয়।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, মামলার শুরু থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁর মতে, অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে কেউ পরিচয় দিলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি ছিল।
অবশেষে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজা থেকে মুক্ত হয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সোনা মিয়া ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। তাঁদের দাবি, রোহিঙ্গা রমজানের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে নিজের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাঁরা ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ, আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের তদন্তের কারণে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন বলেও জানান তাঁরা।