নামাজ মুমিনের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু নামাজে দাঁড়ানোর পর অনেকের মন স্থির থাকে না। একের পর এক নানা চিন্তা মাথায় আসে, কখনো দৈনন্দিন কাজের কথা, কখনো অপ্রাসঙ্গিক বিষয়, আবার কখনো এমন চিন্তাও আসে যা ব্যক্তি নিজেই পছন্দ করেন না। ফলে নামাজের একাগ্রতা বা খুশু নষ্ট হয়ে যায়। ইসলামী পরিভাষায় এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কুমন্ত্রণাকে ‘ওয়াসওয়াসা’ বলা হয়।
কোরআনে নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন নির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করো এবং ফজরের নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৭৮) নামাজের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি এতে মনোযোগ ধরে রাখাও একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নামাজে কুচিন্তা আসা কি ঈমানের দুর্বলতার প্রমাণ?
নামাজে অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা আসার কারণে অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারও কারও মনে হতে পারে, এমন চিন্তা আসার অর্থ হয়তো তাঁর ঈমান দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু হাদিসে এ বিষয়ে মুমিনদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মনের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে অভিযোগ করলে তিনি বলেন, ‘এটিই হলো স্পষ্ট ইমান।’ (মুসলিম: ২৪০)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মাওলানা শামছুদ্দীন দুর্লভপুরি বলেন, কুমন্ত্রণা আসা ঈমান নষ্ট হওয়ার প্রমাণ নয়। বরং এ ধরনের খারাপ চিন্তার কারণে একজন মানুষের মনে যে ভয়, অস্বস্তি বা ঘৃণা তৈরি হয়, সেটিই তার ঈমানের পরিচয় হতে পারে। অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত চিন্তা মাথায় আসা এবং সেই চিন্তাকে গ্রহণ করা—দুটি বিষয় এক নয়।
তাই নামাজে অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা এলে আতঙ্কিত না হয়ে সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তির অন্যতম প্রধান উপায় হলো আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আরাফ: ২০০)
অর্থাৎ কুমন্ত্রণা বা প্ররোচনা অনুভূত হলে নিজের শক্তির ওপর নির্ভর না করে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি করণীয়।
আল-আজহার ফতোয়া কমিটির সাবেক প্রধান শেখ আতিয়্যাহ সাকার (রহ.) এ বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কুকুর আক্রমণ করতে এলে সেটির সঙ্গে দীর্ঘ সময় লড়াই করার পরিবর্তে তার মালিককে ডাকলে সহজে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একইভাবে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়াকে তিনি কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। (ফাতাওয়া আল-আজহার: ১০/১২০)
নামাজে মনোযোগ ফেরানোর উপায়
নামাজে মনোযোগ ধরে রাখতে কয়েকটি বিষয়ে সচেতন থাকা যেতে পারে। প্রথমত, নামাজের আগে ও পরে আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং মন স্থির রাখার জন্য তাঁর সাহায্য চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নামাজে দাঁড়ানোর সময় নিজের মনে এ অনুভূতি জাগ্রত করা প্রয়োজন যে, আপনি মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে ইবাদত করছেন।
দ্বিতীয়ত, দৃঢ় সংকল্প রাখা জরুরি। নামাজে মন অন্যদিকে চলে যেতেই পারে। কিন্তু মনোযোগ সরে গেলেই হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের মনকে আবার নামাজের দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কোরআন তিলাওয়াত, জিকির বা দোয়ার অর্থের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে একাগ্রতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, কুমন্ত্রণা বা অপ্রাসঙ্গিক চিন্তাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো চিন্তা মাথায় এলেই সেটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া বা বারবার চিন্তা করতে থাকলে মনোযোগ আরও বিচ্ছিন্ন হতে পারে। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তাকে উপেক্ষা করে ইবাদতের দিকে মন ফেরানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন।
হতাশ না হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে
নামাজে মনোযোগ হারানো অনেকের জন্যই একটি বাস্তব সমস্যা। তবে এ কারণে ইবাদত থেকে নিরুৎসাহিত হওয়া উচিত নয়। বরং প্রতিবার মন অন্যদিকে চলে গেলে ধৈর্য ধরে আবার নামাজের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
কোরআনে শয়তানের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তাদের ওপর তার কর্তৃত্ব নেই। (সুরা হিজর: ৪২) তাই নামাজে কুমন্ত্রণা এলে ভয় বা হতাশায় না পড়ে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা, তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং মনকে বারবার ইবাদতের দিকে ফিরিয়ে নেওয়াই হতে পারে এ সমস্যা মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
নামাজে একাগ্রতা একদিনে অর্জিত নাও হতে পারে। নিয়মিত চেষ্টা, আল্লাহর স্মরণ এবং ইবাদতের প্রতি মনোযোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নামাজে মনোযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা আসাকে নিজের ঈমান সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণ না বানিয়ে তা উপেক্ষা করে আল্লাহর দিকে মন ফেরানোই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।