নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় গণপরিবহন নিশ্চিত করতে রাজধানীতে ‘পিংক বাস’ সেবা আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৪টি রুটে মহিলা বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারে নিরাপত্তা ও স্বস্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
রাজধানীতে গণপরিবহনে নারীদের নানা ধরনের সমস্যার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। অতিরিক্ত ভিড়, নির্ধারিত আসনের সংকট, যৌন হয়রানি, অনিরাপদ পরিবেশ এবং কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় নানা ধরনের বিড়ম্বনার কারণে অনেক নারীকে গণপরিবহন ব্যবহারে সমস্যায় পড়তে হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘পিংক বাস’ সেবার পরিধি বাড়ানো হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নারীরা তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত বেশি, সেসব এলাকায় নারী বাস সার্ভিস চালু করা হলে প্রতিদিনের যাতায়াতে ভোগান্তি কমতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহিলা বাস সার্ভিসকে ১৪টি রুটে বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব রুটে নারীদের যাতায়াতের চাহিদা, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। পর্যায়ক্রমে রুট ও বাসের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গণপরিবহনে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে শুধু নারী যাত্রীদের জন্য বাস চলাচল করলে অতিরিক্ত ভিড় ও হয়রানির ঝুঁকি কমতে পারে। পাশাপাশি নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত আসন, ওঠানামার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সেবাটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।
বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের জন্য এ ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিদিন অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন কর্মস্থলে যাতায়াত করতে গিয়ে নারীদের দীর্ঘ সময় গণপরিবহনে কাটাতে হয়। নির্দিষ্ট রুটে নিয়মিত মহিলা বাস চললে তাদের সময় ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কাছেও নারী সদস্যদের একা যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও পিংক বাস সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতের জন্য নিরাপদ পরিবহন প্রয়োজন। বিশেষ করে সকালে ও বিকেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত বাস থাকলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে।
তবে শুধু বাসের সংখ্যা বাড়ালেই সেবা কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্ধারিত সময়সূচি মেনে বাস পরিচালনা, পর্যাপ্ত সংখ্যক বাস, দক্ষ চালক ও কর্মী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বাসের রুট ও সময়সূচি অনলাইনে সহজে পাওয়া গেলে নারীদের জন্য যাতায়াত পরিকল্পনা করাও সহজ হবে।
পিংক বাস সার্ভিসের ক্ষেত্রে ভাড়া যেন সাধারণ যাত্রীদের নাগালের মধ্যে থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেবাটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে পরিচালন ব্যয়, ভাড়া কাঠামো এবং যাত্রী চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
রাজধানীর যানজটের বিষয়টিও এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একই রুটে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকলে নির্ধারিত সময়ে বাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই নারী বাস সার্ভিসের রুট নির্ধারণের সময় যানজটের চাপ, বিকল্প সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন সংযোগগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আলাদা বাস সার্ভিসের পাশাপাশি পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলো, চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া থাকলে যাত্রীদের আস্থা বাড়বে।
নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ থাকলে অনেক নারী দূরের কর্মস্থলে যাতায়াত করতে উৎসাহিত হতে পারেন। ফলে নারী কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতেও এই ধরনের উদ্যোগ পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ১৪টি রুটে মহিলা বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের জন্য একটি বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাসগুলো নিয়মিত চলাচল, নির্ধারিত রুটে সেবা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত সংখ্যক যানবাহন রাখা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর।
সব মিলিয়ে নারীদের সুবিধা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘পিংক বাস’ সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। ১৪টি রুটে মহিলা বাস সার্ভিস চালু হলে কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ নারী যাত্রীদেরও যাতায়াত আরও স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সেবা সফল করতে নিয়মিত তদারকি, যাত্রীবান্ধব ব্যবস্থাপনা এবং নারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী রুট ও বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো জরুরি।