বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য নয়াদিল্লি অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। এর আগে গত কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। গত ১০ আগস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এরপর দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও যোগাযোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভারতীয় হাইকমিশনার এর আগেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। গত ১৭ আগস্ট তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আরও দ্রুত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি বৈঠকে বসলে বিভিন্ন সমস্যা ও মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে এর আগে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আলোচনা হয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই নেবেন বলে এর আগে দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন। তিনি একই সঙ্গে বলেছিলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে।
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ইতিবাচক পর্যায়ে নেওয়ার আগ্রহও স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকলেও দুই দেশের জনগণের স্বার্থে যোগাযোগ ও আলোচনার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দুই দেশের মানুষের জন্য ভালো সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো হলে উভয় পক্ষই লাভবান হতে পারে।
সম্ভাব্য ভারত সফরটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দিল্লি সফর হলে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সুযোগ তৈরি হবে। সেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, পানি, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরত্ব কমানোর ক্ষেত্রেও শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে এসব বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ২০ আগস্ট সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর দীনেশ ত্রিবেদী কলকাতার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ক্ষতিপূরণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে ভারত সরকার ব্যবস্থা নেবে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ বৈঠকটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা হয়নি।
তবে সামগ্রিক কূটনৈতিক তৎপরতায় বোঝা যাচ্ছে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। ভারতীয় হাইকমিশনারের ধারাবাহিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ ও অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তারেক রহমানের ভারত সফরের দিনক্ষণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। ফলে সফরটি কখন এবং কী পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে, তা নির্ভর করছে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার ওপর। তবে দীনেশ ত্রিবেদীর সর্বশেষ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সম্ভাব্য এই সফরের জন্য নয়াদিল্লি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। সফরটি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি আলোচনা এবং সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।