Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

রোহিঙ্গাদের নিয়ে সেনাপ্রধানের উদ্বেগ, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে চাপের কথা তুলে ধরলেন

রোহিঙ্গাদের নিয়ে সেনাপ্রধানের উদ্বেগ, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে চাপের কথা তুলে ধরলেন

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী চাপ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে এবং তাদের একটি অংশ মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) মিরপুর সেনানিবাসের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে আয়োজিত তিন সপ্তাহব্যাপী ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি কোর্সে অংশ নেওয়া ফেলোদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করেন। এবারের ক্যাপস্টোন কোর্সে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, কূটনীতিক, সাংবাদিক এবং করপোরেট প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশার ৩৭ জন অংশ নেন।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের নিরাপত্তা ও মানবিক দিকের পাশাপাশি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাসের কারণে স্থানীয় পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বনভূমি ও পাহাড়ি এলাকায় বসতি সম্প্রসারণ, জ্বালানি সংগ্রহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক চোরাচালানের বিষয়টিও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় বিভিন্ন সময় সীমান্তপথে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য পাচারের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করছে। সম্প্রতি উখিয়া সীমান্তেও পাঁচটি বস্তা থেকে ৬ লাখ ৭২ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সীমান্তে মাদক পাচার ঠেকাতে নজরদারি ও অভিযান জোরদারের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়ে কোনো বক্তব্য বা অভিযোগ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অপরাধ ও পুরো জনগোষ্ঠীকে এক করে দেখা উচিত নয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশের ওপর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক চাপ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় অংশই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষ।

রোহিঙ্গা সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যয়। বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের জন্য শুধু মানবিক সহায়তা নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যে পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ায় কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে। পাহাড়, বন ও জলাধারসহ স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্যাম্প এলাকায় বসবাসরত মানুষের জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

অন্যদিকে মাদক চোরাচালান ও অন্যান্য অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্র শনাক্ত করার মাধ্যমে পাচার নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাম্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল ভিত্তি। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সহযোগিতা এবং মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব আবারও সামনে এসেছে। পরিবেশের ওপর চাপ, মাদক চোরাচালান ও অপরাধের ঝুঁকি এবং দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ—সবকিছু মিলিয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তাই নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।