Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

সন্তানকে বাঁচিয়ে কাপ্তাই হ্রদে তলিয়ে যাওয়া বাবার মরদেহ ১৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার

সন্তানকে বাঁচিয়ে কাপ্তাই হ্রদে তলিয়ে যাওয়া বাবার মরদেহ ১৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার

রাঙ্গামাটির লংগদুতে আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় সন্তানকে বাঁচিয়ে নিজে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফালান মিয়ার মরদেহ প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে হ্রদের পানি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।

ফালান মিয়া লংগদু উপজেলার গুলশাখালী ইউনিয়নের ছোট মাহিল্যা গ্রামের মো. শাহাবুদ্দিনের ছেলে। তিনি পেশায় জেলে ছিলেন। রোববার সন্ধ্যায় মাছ ধরার কাজ শেষে একটি ছোট নৌকায় সার নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিল আট থেকে নয় বছর বয়সী শিশুপুত্র।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালাপাকুজ্যা ও গুলশাখালী ইউনিয়নের মধ্যবর্তী চৌদ্দ নম্বর বিল এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ ঝড় শুরু হয়। প্রবল বাতাস ও ঢেউয়ের কারণে নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে ডুবে যায়। নৌকাডুবির পর ফালান মিয়া নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছেলেকে আঁকড়ে ধরে পানিতে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন।

নৌকাডুবির পর পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। চারদিকে পানি ও তীব্র স্রোতের মধ্যে নিজের সন্তানকে নিরাপদে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন ফালান মিয়া। একপর্যায়ে দূর থেকে অন্য একটি নৌকা তাদের দেখতে পায়। তখন নিজের শেষ শক্তি ব্যবহার করে শিশুপুত্রকে ওই নৌকার যাত্রীদের কাছে তুলে দিতে সক্ষম হন তিনি।

সন্তানকে অন্য নৌকায় নিরাপদে তুলে দেওয়ার পরপরই ফালান মিয়া হ্রদের পানিতে তলিয়ে যান। এরপর থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। খবর পেয়ে স্থানীয়রা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানালে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

রোববার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত নিখোঁজ ফালান মিয়াকে উদ্ধারে চেষ্টা চালানো হয়। পরে সোমবার সকালে আবারও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর কাপ্তাই হ্রদের পানি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

স্থানীয়রা জানান, নিজের জীবন বাঁচানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সন্তানকে নিরাপদে তুলে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন ফালান মিয়া। তীব্র স্রোত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। পরে ছেলেকে অন্য নৌকায় তুলে দিতে পারলেও নিজে আর পানির ওপর ভেসে থাকতে পারেননি।

এই ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। একজন বাবার আত্মত্যাগের এই ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করেছে। দুর্ঘটনার পর পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

বর্ষাকালে কাপ্তাই হ্রদে হঠাৎ ঝড় ও ঢেউয়ের কারণে ছোট নৌকাগুলো প্রায়ই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ছোট নৌযানগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। স্থানীয়রা এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঝড়ের পূর্বাভাসের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৌযানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকারিয়া হোসেন জানান, উদ্ধার করা মরদেহের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ফালান মিয়ার মৃত্যু একটি মর্মান্তিক নৌদুর্ঘটনা হলেও সন্তানকে বাঁচাতে তাঁর শেষ মুহূর্তের চেষ্টা স্থানীয়দের কাছে এক হৃদয়বিদারক আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নিজের জীবনের বিনিময়ে সন্তানকে নিরাপদে তুলে দিয়ে তিনি যে দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার পরিচয় দিয়েছেন, তা এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক এবং মানবিক দিক হয়ে উঠে এসেছে।