মাগুরার বহুল আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর রায়ের দিন পিছিয়ে আগামী সোমবার ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নতুন দিন নির্ধারণ করেন।
মঙ্গলবার এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। আদালতের কার্যক্রমের শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক সময় আবেদন করেন। তিনি আদালতকে জানান, মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানি করেছেন। বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এ কারণে রায় ঘোষণার আগে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে আরও সময় প্রয়োজন। আদালত তার আবেদন মঞ্জুর করে রায়ের জন্য আগামী সোমবার দিন ধার্য করেন।
এর আগে সোমবার (২৪ আগস্ট) হাইকোর্ট আলোচিত এই মামলায় হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর রায় ঘোষণার জন্য ২৫ আগস্ট তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের কারণে নির্ধারিত দিনে রায় ঘোষণা হয়নি।
মামলায় আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাফিজুর রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে রয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক।
মাগুরা সদর উপজেলার নিজনান্দুয়ালী এলাকায় ঘটে যাওয়া শিশু আছিয়ার নির্মম মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের ৫ মার্চ রমজানের ছুটিতে বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আট বছর বয়সী আছিয়া ধর্ষণের শিকার হয়। শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখ তার ওপর যৌন নির্যাতন চালানোর পাশাপাশি তাকে হত্যার চেষ্টা করেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার পর শিশুটিকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় নিহত শিশুর মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশ মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
মামলাটির তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর ২৩ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। ২৭ এপ্রিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মামলায় মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন।
মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুত শেষ করা হয়। গত বছরের ৭ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম মাত্র ১৩ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়। এরপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের ধাপও শেষ হয়। গত বছরের ১৩ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসানের আদালতে মামলার শেষ দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।
যুক্তিতর্ক শেষে ১৭ মে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেন মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
তবে মামলার বাকি তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। তারা হলেন নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ, সজীব শেখের ১৭ বছর বয়সী ছোট ভাই এবং সজীবের মা জাহেদা বেগম। আদালতের রায়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে আইন অনুযায়ী তা কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ কারণে মামলার নথিপত্র ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২১ মে শিশু আছিয়া হত্যা মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে মামলার নথি যাচাই-বাছাই করে পেপারবুক তৈরির জন্য বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ার পর গত ৮ জুন তা হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর মামলাটি শুনানির জন্য বিশেষায়িত হাইকোর্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় ওঠে।
হাইকোর্টে বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদন করা হবে কি না, সেই ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি আসামি হিটু শেখের করা আপিলের বিষয়টিও শুনানি হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার রায় ঘোষণার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের কারণে তা পিছিয়ে গেল।
শিশু আছিয়ার মৃত্যু এবং মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু থেকেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। শিশুটির ওপর নির্যাতন এবং পরবর্তী মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছিল। বিচারিক আদালতের রায়ে প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
আগামী সোমবার হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও আসামির আপিলের ওপর কী সিদ্ধান্ত দেন, সেটিই এখন মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে, পরিবর্তন হবে নাকি অন্য কোনো আদেশ আসবে—তা সেদিন জানা যাবে।