অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে ৯ উইকেটের বড় জয় তুলে নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়েছে টাইগাররা। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—প্রায় প্রতিটি বিভাগেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা অস্ট্রেলিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। চার দিনে ১১টি সেশনের খেলায় অধিকাংশ সময়ই স্বাগতিকদের চাপে রাখে বাংলাদেশ। ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও অকপটে স্বীকার করেছেন, পুরো ম্যাচে বাংলাদেশ তাদের চেয়ে ভালো ক্রিকেট খেলেছে।
ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল দলীয় প্রচেষ্টার দারুণ উদাহরণ। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করার পর ব্যাট হাতে বড় সংগ্রহ গড়ে বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান তামিমের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস এবং মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে ৪২৬ রান সংগ্রহ করে টাইগাররা। এতে প্রথম ইনিংসেই ২২৮ রানের বিশাল লিড পেয়ে যায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিকরা। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়। সেই লক্ষ্য মাত্র এক উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ে টাইগাররা।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স নিজের দলের ব্যর্থতার জন্য কোনো অজুহাত দাঁড় করাননি। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তুতিতে বড় কোনো সমস্যা ছিল না। বরং বাংলাদেশই পুরো ম্যাচে নিজেদের পরিকল্পনা ও দক্ষতার যথাযথ প্রয়োগ করেছে।
কামিন্সের ভাষায়, তাদের প্রস্তুতি ঠিকঠাক ছিল এবং পরাজয়ের জন্য কোনো অজুহাত নেই। বাংলাদেশের ভালো খেলার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার আরও বেশি সময় ব্যাটিং করে উইকেটে টিকে থাকা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি বল হাতে বাংলাদেশি ব্যাটারদের ওপর তারা যথেষ্ট চাপ তৈরি করতে পারেনি বলেও স্বীকার করেন অজি অধিনায়ক।
বাংলাদেশের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কামিন্স আরও স্পষ্টভাবে বলেন, ‘বাংলাদেশ সব দিক থেকেই আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে।’ তাঁর মতে, বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা পুরো ম্যাচে ধৈর্য ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন। টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের মনোযোগ ও পরিকল্পনা ধরে রাখাই ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক বিশেষভাবে ক্যামেরন গ্রিনের ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে গ্রিন একপ্রান্ত আগলে রেখে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসকে বড় বিপর্যয় থেকে কিছুটা টেনে তোলেন। তাঁর ব্যাটিংয়ের গতি ও মান দেখিয়েছে তিনি কতটা ভালো ক্রিকেটার—এমন মন্তব্য করেন কামিন্স।
তবে শুধু গ্রিনের একক লড়াই যথেষ্ট ছিল না বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক। তাঁর মতে, গ্রিনের সঙ্গে আরও দুই-একজন ব্যাটার যদি দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকতে পারতেন, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের চিত্র ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিয়মিত উইকেট হারানোর কারণে বড় লক্ষ্য নির্ধারণের সুযোগ পায়নি স্বাগতিকরা।
ডারউইনে বাংলাদেশের এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, দেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর আগে বাংলাদেশ কোনো টেস্ট জিততে পারেনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দ্বিতীয়বারের মতো অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে প্রথম টেস্টেই স্বাগতিকদের হারিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে বাংলাদেশ।
এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। ফলে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের সামনে ইতিহাস গড়ার আরও বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জয় করতে হলে পরের ম্যাচে টাইগারদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। আর অস্ট্রেলিয়ার জন্য সিরিজ বাঁচাতে দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে পেসার হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দুই ইনিংস মিলিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে বারবার চাপ তৈরি করেন। পাশাপাশি তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ স্পিন দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেন।
সব মিলিয়ে ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল পরিকল্পিত, ধৈর্যশীল ও আত্মবিশ্বাসী। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের ঘরের মাঠে এমন আধিপত্য বিস্তার করে জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। আর প্রতিপক্ষ অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের মুখে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্বের এই স্বীকৃতি সেই ঐতিহাসিক জয়ের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।